সেরা পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবনাবসান

0
76

 

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাঃ সোমবার দিরাইয়ে শেষকৃত্য

ঢাকাঃ দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর নেই। ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোর রাত ৪টা ২৪ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত, এক সন্তান সৌমেন সেনগুপ্তসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাতবার।

তার পরিবার ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বিকল হয়ে যাওয়ার ফলে ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়ে। গত বছর মে মাসে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। পরে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালেও চিকিৎসা নেন। শুক্রবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার রাত ৮টার দিকে তাকে সিসিইউতে নেয়া হয়। পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। অবস্থার উন্নতি দেখা গেলে সকালে তাকে দেশের বাইরে নেয়া যায় কি না সে কথা ভাবছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে যাওয়ায় ভোরে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়।

গতকাল সকালে হাসপাতাল থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ নেয়া হয় তার ধানমন্ডির ঝিগাতলার বাসভবনে। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য শোকার্ত মানুষ বাসভবনে ছুটে আসেন। দলীয় নেতাকর্মী, মন্ত্রীবর্গ, সংসদ সদস্য, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিবর্গ ছুটে আসেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জিগাতলার বাসায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাবি্ব মিয়া, প্রবাসী কল?্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, চিফ হুইপ আসম ফিরোজ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ আসম ফিরোজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হন।

দুপুরে তার মরদেহ নেয়া হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। সেখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সংসদ ভবনে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণীপেশার মানুষ।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শ্রদ্ধা : বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নেয়া হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সুরঞ্জিতের প্রতি জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান। আওয়ামী লীগ এই নেতার মরদেহে প্রথমে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ; তারপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুরঞ্জিতের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় এরপর। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও প্রয়াত এই সংসদ সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজ এ সময় বিশেষ প্রার্থনা করেন। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে সুরঞ্জিতের জীবনী পড়ে শোনান সংসদের প্রধান হুইপ আসম ফিরোজ। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সৌমেন সেনগুপ্ত।

সৌমেন বলেন, ‘আমি এখন অভিভাবকহীন। তবে আমি নিজেকে অভিভাবকহীন ভাবছি না। আমাদের পরিবারের সঙ্গে সব সময় প্রধানমন্ত্রী আছেন। আমাদের এই ক্রাইসিস টাইমে তিনি আমাদের পাশে থাকবেন আশা করি। আমার বাবা সারা জীবন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেছেন। সবসময় মানুষের উপকার করেছেন।’

বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কৃষক, শ্রমিক, জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি (জেপি), সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এছাড়াও মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী কয়েক মিনিট সৌমেনের সঙ্গে কথা বলেন।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শ্রদ্ধা : আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মুকুল বোস, ঐক্য ন্যাপের আহ্বায়ক পংকজ ভট্টাচার্য, রাম কৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দের নেতৃত্বে মিশনের ভক্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত সেন দীপুর নেতৃত্বে পূজা উদযাপন পরিষদ, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এটিএম শামসুজ্জামান, স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজি সেলিম, আ’লীগ নেতা ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য মাহামুদুর রহমান বাবু, অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন, নুরুর রহমান সেলিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অনুষ্ঠানে।

এছাড়া  আরও ছিলেন আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা ফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য ফোরাম, সাংবাদিকদের সংগঠন স্বজন, স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ ছাত্রলীগের প্রতিনিধি, ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার আদশ সাইকি, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি রাজেশ উকি, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা নিতাই রায় চৌধুরী, জয়নাল আবদীন ফারুক প্রমুখ।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ ল্যাবএইড হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে। পরদিন সোমবার সকালে হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ সিলেট নেয়া হবে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে তার নির্বাচিত এলাকা দিরাই ও শাল্লাতে  শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকালে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী দিরাইয়ের নিজ গ্রামে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে পরিবার থেকে জানানো হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৬ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের আনোয়ারাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য সুরঞ্জিতের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বামপন্থী রাজনীতির মধ্য দিয়ে। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদসহ তিনি সাত বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তুখোড় এই পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন বর্তমান সংসদে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পরে ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল’ কলেজ থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ‘ল’ পাসের পর কিছু দিন তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ভিপি প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পিকিং ও মস্কো ধারায় দুই ভাগ হলে মাওলানা ভাসানীর পক্ষ ত্যাগ করে সুরঞ্জিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশে যোগ দেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ন্যাপ থেকে বিজয়ী হন। পরে ন্যাপের ভাঙনের পর গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।

পঞ্চম সংসদের সদস্য থাকাকালেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরে দলটির সভাপতিম-লীর সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেন ভোটে হেরে গেলেও পরে হবিগঞ্জের একটি আসনে উপ-নির্বাচন করে তিনি বিজয়ী হন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন তিনি।

২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুরঞ্জিত আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন সুরঞ্জিত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলন তিনি পুনরায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে তিনি আবারও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

জয়া সেনগুপ্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ডক্টরেট। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার শিক্ষাবিভাগে সমন্বয়কারী পদে দায়িত্ব পালন করেন। সৌমেন সেনগুপ্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং কানাডা থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসা করছেন। সৌমেনের স্ত্রী রাখী মৈত্রী সেনগুপ্ত পেশায় চিকিৎসক।

প্রতিক্রিয়া

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে দেশের রাজনীতির একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সংসদ হারাল অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ানকে। দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক মেধাবী ব্যক্তিত্ব। তার বাচনভঙ্গি, যুক্তি-তর্ক ছিল সবার জন্য অনুকরণীয়। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জাতি তার অবদানকে চিরকাল স্মরণ করবে।

গতকাল সকালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জিগাতলার বাসায় তাকে শেষবারের মতো দেখতে যান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। সেখানে তারা পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। সহমর্মিতা জানান। পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে এই মেধাবী সন্তানের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই এলাহী চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় অধ্যায় হারিয়ে গেল। তার বাচনভঙ্গি, যুক্তি-তর্ক ছিল অনুকরণীয়। ২৬ বছর বয়স থেকে তিনি ছিলেন সংসদ সদস্য। সংসদ ও সংবিধানকে কার্যকর করে তুলতে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, পার্লামেন্ট লস্ট এ গ্রেট পার্লামেন্টারিয়ান। সুরঞ্জিত খুবই জনপ্রিয় রাজনীতিক ছিলেন। তিনি দাঁড়ালে আর কেউ কথা বলতো না। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

গতকাল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন দেশের একজন অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিক। সাতবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন জনমানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ।

গতকাল সকালে ভোলা সার্কিট হাউসে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জাতীয় সংসদে একজন বিখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। তিনি যখন সংসদে বক্তৃতা করতেন, তখন সবাই তন্ময় হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন। তার মৃত্যুতে দলেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, পার্লামেন্ট সম্পর্কে তার যে জ্ঞান ছিল তা অতুলনীয়। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বে আঘাত হয় এমন কিছু ভুল হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করতেন। সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে, সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনি তার অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। জাতি তার অবদানকে চিরকাল স্বরণ করবে।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশের বয়স আর তার রাজনীতি জীবনের বয়স সমান। তার সমতুল্য রাজনীতিক আর বেশি নেই। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি বিপুল অবদান রেখে গেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, তরুণ বয়স থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনীতি করতেন। তার মতো একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান দেশে দ্বিতীয়জন আর নেই। তার অভাব অপূরণীয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি নাম্বার ওয়ান বলে আমার মনে হয়। তার মৃত্যুতে বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এটা সহজে পূরণ হওয়ার না।

দুপুর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজ দেশ ও জাতি অনেক বড় একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে হারিয়েছে। তার মতো একজন পার্লামেন্টারিয়ান হারানো রাজনীতিতে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হওয়া। আমি দলের পক্ষ থেকে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। রাজনৈতিক সংকটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। মানুষের মাঝে আস্থা তৈরি করতেন।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন অতুলনীয় পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। তার মতো আর একজনও পার্লামেন্টারিয়ান নেই। তরুণ বয়স থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রাজনীতিকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে জাতি এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল।

শোক প্রস্তাব

এদিকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রয়াত এই নেতার সম্মানে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার সময়ে একাই এক শ ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার চতুর্দশ অধিবেশেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

এরপর শোকপ্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ আরো অনেকে আলোচনায় অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এই সংসদে সবাই একসাথে ছিলাম। ২০১৪ সালে একটা বৈরী পরিবেশে নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে আমরা সংসদে এসেছি। এখানে বসে জনগণের কল্যাণে অনেক আইন পাস করেছি। তাই যখন কোনো সংসদ সদস্যকে হারাই তখন কষ্টের কোনো সীমা থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আমি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর খবর পাই। সাথে সাথে তার স্ত্রীকে ফোন করি। তার সঙ্গে কথা বলি। গতরাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। কিন্তু সেই সুযোগটাও তিনি আমাদের দিলেন না। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় তাকে (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) উৎসাহিত করতেন। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, ৭০ সালের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছিলেন, তাদের নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের পর গণপরিষদ গঠন করা হয়। সেখানেই আমাদের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়। সংবিধান রচনা করার সময় অনেক আলাপ-আলোচনা তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলতে গেলে তখন বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন একাই এক শ। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাস করতেন। আমরা একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারালাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একটি ক্ষতবিক্ষত সংবিধান পেয়েছিলাম। সেই ক্ষতবিক্ষত সংবিধানকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের আন্দোলন করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামের পথে একজন সাথী ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।’

Print Friendly