শুভ নববর্ষ ১৪২৪ ! সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বর্ষবরণ এবছর

0
25

শুভ নববর্ষ ১৪২৪।  সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজ বাংলা বর্ষবরণের প্রাণের উৎসব-আনন্দে মেতেছে বাঙালি। বাংলা নতুন বছর ১৪২৪ সালকে স্বাগত জানিয়ে পূর্ব আকাশে বছরের সূর্য উঠার সাথে সাথে সবার হৃদয়ে অবিরাম বেজে উঠেছে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…’।

ভোরের নতুন সূর্যোদয়ে রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী সংগীতের মধ্য দিয়ে বাঙালী এবারও নতুন বছরকে বরণ করে নেয় যথারীতি। শুক্রবার সকাল সোয়া ছয়টায় গানে গানে, কবিতায়, বাদ্যযন্ত্রের মুর্ছনায় শুরু হয়েছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বেজে ওঠে, এসো এসো হে বৈশাখ এসো এসো। সকাল সোয়া ছয়টায় রমনা বটমূলে শুরু হয় বর্ষবরণের মূল উৎসব। 

তবে ঢাকাসহ চট্রগ্রামে জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদী তৎপরতাসহ কোনো অন্ধকারের অপশক্তির কাছে মাথা না নোয়ানোর শপথের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের আবাহন লক্ষ করা গেছে এবছর।
বর্ষবরণের ‘দেয়ালচিত্র’ মুছে দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মৌলবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতাকে ব্যর্থ করে দিয়ে দৃশ্যত নগরবাসী এবছর মেতেছে এক ভিন্ন মাত্রার অসাম্প্রদায়িক বাংলা নববর্ষ উদযাপনে।

পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজনকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে সম্প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের প্রচারণার মধ্যে জনদুর্ভোগের কারণ দেখিয়ে ঢাকায় আওয়ামী লীগের শোভাযাত্রা বাতিল করায় প্রগতিমনা মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার ছাপ চট্টগ্রামে পড়েছে এবার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গল শোভাযাত্রার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বললেও, হেফাজতে ইসলামের চাপে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবি মানার পর দলের শোভাযাত্রা বাতিল করায় তৈরি হয়েছে আরও এক নতুন শঙ্কা।

চট্রগ্রামে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রাটি, মেহোদী বাগ কাজীর দেউড়ি ও জামালখান হয়ে সার্সন রোড হয়ে ফের চারুকলা ইনস্টিটিউটে গিয়ে শেষ হয়েছে । শোভাযাত্রায় চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ঢোল বাজিয়ে নানা রকমের টেপা পুতুল, মুখোশ নিয়ে সবাই আনন্দে মেতে ছিল শোভাযাত্রায়। বর্ষ বরণের আয়োজনের জন্য আঁকা দেয়ালচিত্র পোড়া মবিল দিয়ে মুছে দেওয়ার পরও কোনো কমতি ছিল না এ আয়োজনে। নতুন করে আবার দেয়ালে এঁকেছেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ডিসি হিলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ।’

পূবাকাশে ভোরের লালিমা আভায় স্বর্ণময় চক্রবর্ত্তীর ‘বিলাশখানি টোড়ি রাগের’ মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার আয়োজন। একে একে বিভিন্ন সংগঠন ও শিল্পী পরিবেশন করেন দলীয় ও একক গান ও নৃত্য।

সিআরবি শিরিষ তলার নববর্ষ আয়োজনের অনুষ্ঠান শুরু হয় ‘ভায়োলিনিস্ট চিটাগাং’ নামে একটি সংগঠনের দলীয় বেহেলার সুরে। রোদের তীব্রতা উপেক্ষা করে নগরবাসী ছুটছে ডিসি হিল ও সিআরবি বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। সব জীর্ণতা ও বাঁধা ডিঙে সব বয়সীরা মেতে উঠেছে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে। নেচে গেয়ে মুখে রঙ লাগিয়ে নানা রঙে সেজে ভেদাভেদ ভুলে একে অন্যের সাথে মেতে উঠেছে উৎসব আনন্দে। এ দুটি বড় অনুষ্ঠান ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে আলাদা করে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

‘জঙ্গি নির্মুল চেতনায় শাণিত বৈশাখ’ স্লোগান নিয়ে এবছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের আশে পাশে জমে উঠেছে বৈশাখী মেলা। সূর্যের সেই আলোতেই পুরনো পঙ্কিলতা আর উগ্রবাদের কালোকে রোখার ডাক এল এবারের বর্ষবরণ উৎসবের মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’- এই প্রতিপাদ্যে বঙ্গাব্দ ১৪২৪ কে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে।

শুক্রবার বৈশাখের প্রথম সকালে চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হয় শোভাযাত্রা। শাহবাগ মোড়-রূপসী বাংলা হোটেল-শাহবাগ-টিএসসি ঘুরে ফের চারুকলার সামনে এসে এই বর্ণিল যাত্রার শেষ হয়।

শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক; অপশক্তি আর সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে রুখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান এসেছে তার কাছ থেকে।

শোভাযাত্রার শুরুতে তিনি বলেন, “কুসংস্কার, অন্ধকারাচ্ছন্ন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী যে অপশক্তি আছে মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে আমরা তাদের নির্মূল কামনা করি। সেইসঙ্গে শান্তি সমৃদ্ধি ও সফলতা কামনা করি। এটা হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য। অপশক্তি, সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাব। সেই এগিয়ে যাওয়া কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।”

১৯৮৯ সালে স্বৈরাচার বিরোধী ভাবমূর্তি নিয়ে চারুকলা থেকে শুরু হয় পহেলা বৈশাখের এই আনন্দ শোভাযাত্রা। সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে চারুকলার এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ গত বছর ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ এর স্বীকৃতি পায়।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের কারণে এই শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “ইউনেস্কো আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কেন করেছে? কারণ বাংলাদেশে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, সেটা কেবল বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গল কামনা করে নয়, পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের মঙ্গল কামনা করে করা হয়।”

১৯৮৯ সালের প্রথম শোভাযাত্রার ঘোড়া ও বিশাল বাঘের মুখ রয়েছে, রয়েছে সমৃদ্ধির প্রতীক হাতি। এছাড়া বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির শিল্পকাঠামোগুলোও ফিরে এসেছে।

সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষের এই শোভাযাত্রায় সামনে-পেছনে ঢাকের বাদ্যের তালে তালে চলে নৃত্য, হাতে হাতে ছিল বড় আকারের বাহারি মুখোশ।

টেপা পুতুল আর বাঁশের কাঠামোতে মাছ, পাখির মত নানা লোকজ মোটিফে ফুটিয়ে তোলা হয় বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য। সেসব প্রতীক আবার ধারণ করেছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের চিহ্ন, অমঙ্গলের আঁধার ঘোচানোর প্রত্যয়।

প্রকৃতির প্রতি সচেতনতার প্রতীক হিসেবে গাছ-পাখি-সূর্যের একটি শিল্পকাঠামো ছিল এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়।

মঙ্গলের আকাঙ্ক্ষায় এই শোভাযাত্রার মূল কাঠামোতে ছিল অনেকগুলো সূর্যের মুখ, যার একপাশে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত রূপ, অন্যদিকে সূর্যের বিপরীতে অন্ধকার কদাকার রূপ। মানব মনের অন্তনির্হিত এ দুই রূপ ফুটিয়ে তুলেছে শুভ আর অশুভর চিরায়ত লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।

মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরুর আগে উৎসবের আঙ্গিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনের সড়কে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে। বৈশাখের লাল-সাদার ভিড়ে বেশ কিছু বিদেশি মুখও দেখা গেছে।

সবার নিরাপত্তা দিতে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসির সদস্যরাও ছিলেন। র‌্যাবের টহল হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হয় বৈশাখী শুভেচ্ছার কার্ড। তবে অতি কড়াকড়ির কারণে উৎসব বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

সর্বজনীন এই উৎসবটি আজ বাঙালির জীবনাচার, চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে একাকার হয়ে। বাংলা নববর্ষ কেবল আনুষ্ঠানিকতানির্ভর কোন উৎসব নয়; এটি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, শেকড় সন্ধানের মহান চেতনাবাহী দিন। তাই বিধিনিষেধের বেড়াজাল উপেক্ষা করে শহর-নগর, গ্রাম-গ্রামান্তর সর্বত্রই বইবে বর্ষবরণের প্রাণোচ্ছল উৎসব-তরঙ্গ। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ও রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হওয়া এর সবই বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাণী। বিদায়ী বছরের অনেক না পাওয়া, দুঃখ-গ্লানিকে পেছনে রেখে নতুনের কেতন ওড়ানো বৈশাখ এসেছে তাই নতুন সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও সমৃদ্ধি অর্জনের লড়াইয়ে জয়লাভের প্রতিশ্রুতি ও প্রেরণা নিয়ে।

মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ খান সিরাজী প্রায় চারশ বছরেরও আগে হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। তখনই বঙ্গাব্দের সূচনা হয় বৈশাখের প্রথমদিন থেকে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা এই জনপদের মানুষের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈশাখী উৎসব সংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ এক উপাদানে পরিণত হয়েছে। এককালে বাংলা নববর্ষে হালখাতাই মুখ্য ছিল। এর সঙ্গে কিছু উৎসব ছিল, ছিল কিছু আনন্দসম্ভার। এখনও হালখাতা আছে। ক্রমেই মুখ্য হয়ে উঠছে আনন্দ-উৎসব।

চৈত্রের শেষ দিনে গ্রাম ও শহরে ব্যবসায়ীরা গত বছরের বিকিকিনির হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছেন। আজ খুলবেন তারা হালখাতা। বিভিন্ন স্থানে বসেছে বৈশাখী মেলা। পটুয়া আর মৃৎশিল্পীরা মেলায় নিয়ে আসছেন তাদের সৃজন সম্ভার। নাগরদোলায় চড়া আর খেলনা, পুতুল, বাঁশিসহ বৈশাখী মেলার রকমারি পণ্য কেনার দুর্নিবার আকর্ষণে ছেলে-বুড়ো সবাই আজ মেলামুখো। আশপাশে তাকালে দেখা যাবে পোশাকেও রয়েছে বাঙালিয়ানার ছাপ। নারীরা আজ পড়েছেন নানা রঙের বিশেষ করে লাল পাড়ে সাদা শাড়ি। কেউ কেউ খোঁপা বা বেণীতে গুঁজেছেন নানা রঙের ফুল। হাতে পড়েছেন চুড়ি, কানে দুল। ছেলেরা পরবেন পাঞ্জাবি। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে হাওয়াই মিঠাই, রঙিন বেলুন, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল, জিলাপি, খৈ-বাতাসা, ঘরগেরস্তির দরকারি বস্তুসহ নানা সামগ্রী। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা শহরাঞ্চলেও সম্প্রসারিত হয়েছে। রমনার বটমূলে ষাট দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নবউন্মেষকালে ছায়ানট সেই যে কাকডাকা ভোরে নববর্ষকে আবাহনী গান গেয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সেটি আজ রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আজ সমগ্র রাজধানীর পথ মিশে গেছে রমনায় এসে। তবে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণের অনুষ্ঠানটি আজকাল আর রাজধানী ঢাকার রমনাতেই কেবল সীমাবদ্ধ নেই, নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এবারও মিরপুর, গুলশান, উত্তরা, সাভার প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বর্ষবরণ উদযাপিত হচ্ছে। আর ঢাকার বাইরে গ্রামবাংলায় হচ্ছে এক ভিন্ন আমেজের বর্ষবরণ । সেখানে মেলার আয়োজনই মুখ্য।

Print Friendly