বাংলা কবিতার কিংবদন্তী আবৃত্তিকার কাজী আরিফের জীবনাবসান

0
53

আকবর হায়দার কিরন: বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা আবৃত্তিকার, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থপতি কাজী আরিফ আর বেঁচে নেই। আজ ২৯ এপ্রিল শনিবার নিউ ইয়র্ক সময় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা খুলে ফেলেছেন। কয়েক মুহূর্ত আগে সার্বক্ষণিকভাবে পাশে থাকা মিথুন আহমেদ খবরটি নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

ম্যানহাটনের মাউন্ট সিনাই সেন্ট লিওক্স হাসপাতালে গত মঙ্গলবার ওপেন হার্ট সার্জারির পর তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট উত্তর আমেরিকার সভাপতি মিথুন আহমেদ, আবৃত্তিকার গোপন সাহা সহ অনেকেই শুক্রবার সারারাত হাসপাতালে অবস্থান করেন এবং সকালে কিছুক্ষনের জন্যে বাসায় এসে আবার সেখানে ফিরে যান। কিছু গনমাধ্যম অতি উৎসাহী হয়ে শুক্রবার রাত থেকেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচার শুরু করে। বাংলাদেশ, কানাডা সহ বিশ্বের নানান প্রান্ত দেখে কাজী আরিফের সর্বশেষ খবর জানতে চেয়ে এই প্রতিনিধির কাছে অসংখ ফোন আসতে থাকজানেখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গেলো ২১ এপ্রিল কাজী আরিফ এই প্রতিনিধিকে পাঠানো এক টেক্সট ম্যসেজে জানান ‘আমি এখন হাসপাতালে, ২৫ তারিখ আমার ওপেন হার্ট সার্জারি হবে। মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে আছি, দোয়া কোর’।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তার হার্টের ভাল্ব অকেজো হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাল্ব পুনঃস্থাপন এবং আর্টারিতে বাইপাস সার্জারি করা হয়।

২৪শে এপ্রিল মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সাইনাই সেইন্ট লুকস হাসপাতালে তাঁর এই ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই অস্ত্ৰপচার সম্পূর্ণরূপে সফল না হওয়ায় কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ফুসফুস ও যকৃত সংক্রামিত হতে থাকলে ধীরে ধীরে তাঁর শারিরীক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে এবং নানা প্রকার জটিলতার প্রকোপ বাড়ে।

পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নেয়া হয়। কিন্তু তার জ্ঞান ফেরেনি। এই খবর শোনার পর হাসপাতালের সামনে ভিড় করেন নিউইয়র্কে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাংস্কৃতি কর্মীরা। ডেপুটি কন্সাল জেনারেল শাহেদুল ইসলাম এই সংবাদদাতার কাছে ফোন করে তাঁর খোজখবর নেন এবং হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসেন।

আরিফ ১৯৫২ সালের ৩১ অক্টোবর রাজবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে ১ নম্বর সেক্টরে মেজর রফিকের কমান্ডে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

সত্তর দশকের শেষ ভাগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি দেশের একজন মেধাবী স্থপতি হিসেবেও খ্যাতিমান ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি ক্যাসেটের সূচনা তাঁর হাত ধরে। ‘মুক্তকন্ঠ আবৃত্তি একাডেমী’ নামে আবৃত্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ১৯৮৬ সালে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও ১৪০০ সাল উদযাপন পর্ষদ – এ তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

আবৃত্তি শিল্পীদের নিয়ে গড়ে ওঠা ‘আবৃত্তিকার সংঘ’ তৈরীতেও তাঁর পরিশ্রম অপরিসীম। বাংলাদেশে আবৃত্তিকে একক শিল্পের মর্যাদায় গড়ে তুলবার অন্যতম অগ্রপথিক এবং বাঙলা ভাষায় আধুনিক প্রয়োগ রীতিতে আবৃত্তি চর্চার অন্যতম প্রধান বাকশিল্পী কাজী আরিফ। সংস্কৃতি কর্মী, শিল্পী, আবৃত্তিকার ও প্রবাসের বাঙালী অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এই মহান মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীর প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। কাজী আরিফের স্বদেশ চেতনা ও শিল্পবোধ অম্লান হোক এই অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে।

আকবর হায়দার কিরনঃ খবর ডট কম ও জর্জিয়া বাংলা ডট কমের সহযোগী মিডিয়া গ্রুপ নিউইয়র্ক বাংলা ডট কমের সম্পাদক।

Print Friendly, PDF & Email