মসজিদ ও পারিবারিক ইফতার বনাম দলীয় ও সামাজিক ইফতার পার্টি

রুমী কবির

প্রবাসের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে পবিত্র রমজান মাসে বন্ধু, স্বজন, প্রিয়জন, শুভানুধ্যায়ী ও অতিথিদের নিয়ে একত্রে মিলে মিশে আমরা অনেকেই ইফতারের আয়োজন করে থাকি। আর এর মূল উদ্দেশ্যই হল রমজানের ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য ও মূল্যবোধকে সমুন্নতে রাখতে সবাইকে নিয়ে ইফতারের আনন্দকে ভাগ করে নেয়া অর্থাৎ প্রতিদিনের মত শুধু নিজেরাই ইফতার উপভোগ করা নয়, মাঝে মধ্যে পাড়া প্রতিবেশী বা বন্ধুদের নিয়েও সেই মহৎ কাজে শরীক হওয়ার মাধ্যমে সিয়াম সাধনার রোজাকে তৃপ্তিময় করে তোলা।

এই ধর্মীয় সংস্কৃতিটি আমাদের প্রবাসে সেই শুরু থেকেই চলে আসছে। মনে পড়ে, ১৯৯৪ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে মুভ হয়ে আটলান্টায় যখন এলাম, সেসময় এই শহরে ডাউন টাউনস্থ ফরটিন্থ স্ট্রিটের আল ফারুখ মসজিদ ছাড়া কোন মসজিদই ছিলনা। ফলে অনেকের পক্ষেই সেসময় নিয়মিত অতদুর গিয়ে তারাবি নামাজ আদায় বা ইফতার পর্বে অংশ নেয়ার তেমন কোন উপায় ছিলনা। আমি পরিবার নিয়ে দুই একবার যেতাম, এর বেশি নয়। ফলে আমার মত অনেকেই তখন রোজার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে বাসাতেই একত্রে মিলে মিশে ইফতার করতেন।

আটলান্টার গুইনেট কাউন্টির দারুস সালাম মসজিদের ইফতারের দৃশ্য

মনে আছে, সেসময় প্রায় প্রতি সপ্তাহের উইক এন্ডে বন্ধুদের দুই বা তিনটি পরিবারকে আমন্ত্রণ জানাতাম একত্রে বসে ইফতার উপভোগ করার জন্যে। এভাবে এই সপ্তাহে দুই তিন পরিবার, আবার পরের সপ্তাহে দুই তিন পরিবার, এই করে করে পুরো মাসে মোটামুটি কাছের সকল বন্ধুদের সাথেই ইফতারের আনন্দ ও সওয়াবকে ভাগাভাগি করে নিতাম। একইভাবে আমিও যেতাম পরিবার নিয়ে অন্য বন্ধুদের বাসায়।

তবে সেময়ে আটলান্টার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একটা চমৎকার পরিবেশ ছিল অর্থাৎ একে অপরের সাথে বা এক দলের সাথে আরেক দলের রেষারেষি, ইগো বা মত-পার্থক্য বলতে এখনকার মত এতোটা তীব্র ছিলনা। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া মোটামুটি সম্প্রীতির হাওয়াই বইতে দেখা গেছে কমিউনিটিতে।

আর এখন এই বিশ বা বাইশ বছরের ব্যবধানে এই একই শহরে অনেক কিছুতেই এসেছে পরিবর্তন। বাংলাদেশির সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। নানান এজেন্ডা নিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য সংগঠন। আর সেই সাথে বেড়েছে দ্বন্দ্ব রেষারেষি বা ইগো সংক্রান্ত জটিলতা। তবে গড়পড়তা সম্প্রীতির পরিবেশ আগেও যেমনটি ছিল, এখনও আছে। আর অন্যদিকে সময়ের ব্যবধানে আমাদের পরিবারে আগমন ঘটেছে নতুন প্রজন্মের। এরা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। আর সেইসাথে আমাদের চিন্তা চেতনারও পরিবর্তন হচ্ছে সংগত কারনেই।

দারুস সালাম মসজিদে মুসুল্লিদের ইফতার গ্রহণ

যাই হোক। এবারে মূল প্রসঙ্গে আসি। আমার আজকের লেখার শিরোনামই বলে দিচ্ছে আমি কোন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের চাহিদার আলোকেই গত কয়েক বছরের মধ্যে মেট্রো আটলান্টায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য মসজিদ। ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা এইসব মসজিদে নিয়মিত যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে আমাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি, অনুশাসন, নামাজ, কোরআন শিক্ষা ইত্যাদি নানা বিষয়ে জানতে পারছে, শিখতে পারছে। দৃশ্যত অন্যান্য অভিবাসী মুসলমানসহ বাংলাদেশি অভিবাসীরা মিলে এইসব মসজিদে এখন প্রতি রমজান মাসেই নিয়মিত ইফতার, রাতের খাবার ও তারাবির আয়োজন করছেন। আর এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশি কমিউনিটির অসংখ্য পরিবার স্ত্রী সন্তান নিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধকে যথার্থভাবে আত্মস্থ করার সুযোগ পাচ্ছি।

তো, এর ফলে গত কয়েক বছর ধরেই আমরা লক্ষ করছি, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ মাস রমজান এলেই আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির অগনিত পরিবার মাহে রমজানের ফজিলতকে ধারণ করতে নিয়মিত মসজিদে চলে আসছে। এই পবিত্র মাসে আল্লাহ তায়ালার কাছে কান্নাকাটি করে নিজেদের সারা বছরের নানা গোনাহ থেকে পরিত্রান পেতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ভালো কাজের মধ্য দিয়ে, ধর্ম কর্ম ও রোজার মাধ্যমে চেষ্টা করছেন সওয়াব অর্জন করার জন্যে। ফলে যতই বছর পেরুচ্ছে, ততই দেখতে পাচ্ছি মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের অংশগ্রহণ বেড়েই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই প্রবাসে অমুসলিম পরিবেশে থেকেও আমরা ছেলেমেয়েদেরকে যেভাবে ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষার জন্যে মসজিদে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছি, আজকাল বাংলাদেশের বন্ধু-স্বজনরা হয়তো সেই সুযোগটিও পাচ্ছে না মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বাস করেও।

আমার ধারনা, আমরা যে সময়টাতে দু’চার পরিবার মিলে একসাথে ইফতার করার চর্চায় ছিলাম, তাদের অনেকেই এখন সময়ের ব্যবধানে সেই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে মসজিদমুখী হয়েছেন। তবে এরপরও বাসাবাড়িতে আজকাল বন্ধু-স্বজন প্রতিবেশীদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন চলছে। সংগঠনগুলোও তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা বা দলীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ধর্মীয় আমেজকে ধারণ করে ইফতার পার্টির আয়োজন করছে। কিন্তু একটা বিষয় হয়তো অনেকেরই নজরে আসবে যে, এইসব বাসা বাড়ির ইফতারের আয়োজনগুলি আর আগেকার সময়ের মত দুই চার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আটলান্টায় বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়েছে, সেই সাথে বন্ধুও বেড়েছে, ফলে দাওয়াত দিতে গেলে তো আর কাউকে বাদ দেয়া যায়না, আবার সাংসারিক জীবনেও এত ব্যস্ততা বেড়েছে যে, প্রতি সপ্তাহে বন্ধুদের আমন্ত্রণ করাটাও কষ্টকর ব্যাপার।

আটলান্টার ওমর বিন আব্দুল আজিজ মসজিদের ইফতার ও নৈশ ভোজের জন্যে রান্নায় ব্যস্ত বাংলাদেশি খেদমতগারগণ।

কাজেই দৃশ্যত যা হচ্ছে, তা হলঃ একটি বাড়িতে কম করে হলেও দশ থেকে পনেরো পরিবারকে একইসাথে একই দিনে ইফতারের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। যথাসময়ে বাড়ির লিভিং রুমসহ প্রত্যেকটি ঘর নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোরের উপস্থিতিতে সরব হয়ে উঠছে। মুহূর্তেই পরিবেশটি একটি সম্মিলনী অনুষ্ঠানে পরিনত হচ্ছে। এরপর মেহমানগণ যথারীতি ইফতার পর্ব শেষ করে মাগরিবের নামাজ আদায় করে কিছুটা সময় পান কুশল বিনিময় আর গল্প-সল্প করার। যদি নৈশ ভোজের পরিবেশনায় একটু বিলম্ব ঘটে, তখন দেখা যাচ্ছে অনেকেই মসজিদের নিয়মিত কোরআন পাঠের তারাবির নামাজটি মিস করছেন। সামাজিক ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে না খেয়ে আর বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না বলেই নামাজ থেকে বঞ্চিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আর অন্যদিকে উপস্থিত মেহমানদের মধ্যে এই সুযোগে আলাপচারিতার পর্বটি ধীরে ধীরে ভারী হতে শুরু করে। এক কথায় দুই কথায় চলে আসে বাংলাদেশি কমিউনিটির হালচাল, নেতাদের খোঁজ খবর, কোন সংগঠনটি ভেঙে গেল, কারা পাল্টা দল গঠন করলো, আবার কার সাথে কার সম্পর্কের টানাপড়েন কিংবা পরকীয়া প্রেমের কোন নতুন তথ্য ইত্যাদি সব প্রসঙ্গ শুরু হয়ে যায়। আলাচারিতা রূপান্তরিত হয় আড্ডায়। এমনকি কারো কারো ব্যক্তিগত সমালোচনা ও শেষমেশ কুৎসারটনা পর্যন্তও হয়ে যায় এইসব সরস আড্ডায়।

আর মহিলাদের আসরেও দেখা যায় একই চিত্র। তবে এটিতে থাকে কিছুটা ভিন্নমাত্রার পরচর্চা। হয়তো একজন কথায় কথায় গহনার আলাপ করতে গিয়ে বলে উঠলেন, অমুক ভাবী অনেক দাম দিয়ে একটা সোনার লকেট চেইন কিনেছেন এবারের ঈদে, কিন্তু দেখতে মোটেও ভালো লাগল না, যা-তা আর কি ! আরেক জন হয়তো বললেন, সেদিন অমুক ভাবী হৈ চৈ করে অনেক কিছু রেধে খাওয়ালেন, কিন্তু রান্নাটা তেমন সুবিধার ছিলনা। কেউ আবার প্রতিবেশীর মেয়ের খবর পেটে ধরে রাখতে না পেরে ফিসফিসিয়ে উঠলেন, শুনেছেন ভাবী, ওই মেয়েটি নাকি কার সাথে বেরিয়ে গেছে,  শুনলাম বাবা-মাকে ফেলে রেখে নিজেরাই বিয়ে করে আলাদা বাসা নিয়েছে- এরকম আরও নানা রসগল্প।

তাহলে ফলাফলটি কি দাঁড়ালো! শ্রেষ্ঠ মাস রমজানের পবিত্র রোজা সারাদিন ধরে পালন করার পর দিনের শেষে ইফতার করতে এসে একে অপরের সমালোচনা, কুৎসা বা গিবত গেয়ে পুরো রোজাটিকেই আমরা নষ্ট করে দিলাম।

আমি কোন আলেম বা ধর্মীয় স্কলার নই, কিন্তু মসজিদে বা ধর্মের নানা সুত্র থেকে অন্তত যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয়েছে, রোজার সংযম পালনকালে কারো অনুপস্থিতিতে তার বা তাদের সম্পর্কে সমালোচনা বা গিবত করা হলে সেই রোজার অর্জিত স্কোর শূন্যের কোঠায় যেতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এইভাবে আমি নিজের রোজা নষ্ট করলাম, যারা আমার সাথে এইসব গিবতে অংশ নিয়েছেন, তাদের রোজা নষ্ট হল, এমন কি, যে ব্যক্তিটি কষ্ট করে এতগুলো মেহমানকে দাওয়াত করে বাসায় আহবান করেছেন, তারও রোজা ভেস্তে গেল। এছাড়া নারী-পুরুষের পর্দা রক্ষা করাও খুবই দুরূহ হয়ে উঠে এইসব আয়োজনে।

আজকাল সংগঠনগুলির আহবানে যেসব ইফতার পার্টি হচ্ছে, সেখানেও কমবেশি এই চর্চা চলে সুযোগ পেলেই অর্থাৎ আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্য থেকে কেউ একজন অপরের সমালোচনার একটু রেষ তুলে ধরার চেষ্টা করলেই মুহূর্তেই মহামারীর মতো সেটি একটি সরস আড্ডায় পরিনত হয় এবং গিবতের পর্যায়ে চলে যায়। অবশ্য কোন কোন বাসা-বাড়িতে বা সংগঠনের ইফতার পার্টিতে রোজার পবিত্রতা রক্ষার জোর প্রচেষ্টা চালানো হয় বলে অনেকেই দাবী করেন। পরিবেশকে পবিত্র ও ধর্মীয় ভাবগম্ভীরপূর্ণ রাখতে পারলে তো খুবই উত্তম, কিন্তু কারো মুখের লাগাম আটকে রাখার গ্যারান্টি কে কাকে দেয় ? ধর্মীয় অনুশাসন মেনে এইসব আয়োজন হয়তো সম্ভব হয় তখুনি, যদি সেটা হয় খুবই স্বল্প মানুষের অংশগ্রহণে।

ওমর মসজিদের ইফতার ও নৈশ ভোজের জন্যে বাংলাদেশি খেদমতগারদের ব্যস্ততা।

অবশ্য আমার এক বন্ধু যিনি আটলান্টার বিভিন্ন সংগঠনের ইফতার পার্টিতে আমন্ত্রিত হয়ে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তিনি আমাকে সেদিন আশ্বস্ত করে জানালেন যে, আজকাল সংগঠনগুলিতে আগের মত আর পরচর্চা বা গিবত প্রকাশের প্রবনতাটি দেখা যাচ্ছেনা। এটি একটি ভালো লক্ষণ তার দৃষ্টিতে। তবে বন্ধুটি এই কথাটিও বললেন যে, গিবত না হলেও ইফতারের পর থেকে ডিনার খাওয়া পর্যন্ত সময়ে এমন কিছু আলাপ আলোচনা চলে একে অপরের মধ্যে যে, রোজার ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য ধরে রাখার কোন উপায়ই থাকেনা। যেমন, একে অপরের কুশল বিনিময়ের পর থেকেই নানা বিষয়ে স্বাভাবিক নিয়মে খোঁজ খবর নেয়া শুরু হয়। এরপর নিজের ব্যবসা, কর্মস্থল নিয়ে জাহির করা এবং শেষে দেশের রাজনীতি এমনকি আমেরিকার রাজনীতির নানা বিষয়াদি নিয়ে সবাই মিলে এতটাই মশগুল থাকেন যে, ইফতার পার্টির আমেজটি শেষে একটি পুনঃমিলনী সন্ধ্যায় রূপান্তরিত হয়।

শুধু আটলান্টাতেই নয়, নিউইয়র্ক শহরসহ উত্তর আমেরিকার অনেক শহরেই বাংলাদেশি কমিউনিটির এই ইফতার পার্টির আয়োজন আজকাল একেবারে সেইরকম তুঙ্গে। চারিদিকে একইদিনে ইফতার পার্টির সংখ্যা এতটাই বেশি যে, এই সরগরম আয়োজনের কোনটা রেখে কোনটায় যোগদান করবেন, এই নিয়ে হিমশিম খেতে থাকেন আমন্ত্রিতরা এবং এরপর সেখানকার সরস আড্ডাগুলিতে একইধারার পরচর্চা আর গিবতের তুফান ছুটে।

পবিত্র রমজানের এই ইফতার পার্টির চর্চা শুধু প্রবাসেই নয়, স্বদেশেও চলছে অহরহ। খোদ সরকার থেকে শুরু করে বিরোধী দল , বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার পার্টিতে নেতৃবৃন্দ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে বা দলসমুহকে একচোট সমালোচনা করে নানা আক্রমণাত্মক শব্দাবলী দিয়ে ইচ্ছেমত ঘায়েল করে, ধলাই করে দাবী দাওয়ার জোরালো শব্দগুলো উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করে তারপর ইফতারের খেজুরটি ভক্ষন করছেন এবং তারা যথারীতি রোজার সওয়াব অর্জনের প্রত্যাশাও করছেন। তবে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন এই চর্চার মধ্য দিয়ে কতটা রোজা পালনের সার্থকতা আসে।

আর অন্য দিকে মসজিদের ইফতার আয়োজনের চিত্রটি দেখা যাক। আটলান্টায় বাংলাদেশিদের বিশাল একটি অংশ আজকাল নিয়মিত মসজিদে গিয়ে ইফতার করছেন। এরা ইফতারের পরই মাগরিবের নামাজে অংশ নিচ্ছেন। এরপর কয়েক মিনিটের বিরতি থাকে, এই সময়টাতে মসজিদের তরফ থেকে ইসলামের নানা ইতিহাস, ধর্মীয় বয়ান চলতে থাকে। নৈশ ভোজের পর্ব শেষ হলেই কিছুটা বিরতির পর এশা নামাজের আজান হলে আবারও শুরু হয় ইসলামিক দৃষ্টি ভঙ্গির নানা আলোচনা ও তারাবির নামাজে কোরআন শরীফের যে সুরাগুলি পড়া হবে, সেসব নিয়ে অগ্রিম শানে নজুলসহ আলোচনা এবং তারাবির পর অবশেষে মধ্য রাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন এইসব মুসসল্লিরা অর্থাৎ এখানে গিবত বা পরচর্চা তো দুরের কথা, নিজেদের বৈষয়িক বা সামাজিক খোঁজ খবর বা আলাপেরও কোন সুযোগ নেই।

আবার যারা মসজিদের ইফতারে অংশ নিচ্ছেন না, তারা নিজ বাড়িতেই নিরিবিলিভাবে পরিবারের সাথে ইফতার সেরে নিচ্ছেন, প্রয়োজনে দু’ একজন বন্ধু স্বজনকে একেবারেই সাদামাটা পরিবেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন এবং তারাবির আগে সরাসরি মসজিদে গিয়ে এশাসহ তারাবিতে অংশ নিচ্ছেন। মোট কথা এইভাবে মসজিদে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমার ধারনা, আটলান্টার মোট বাংলাদেশিদের অর্ধেকরও বেশি সংখ্যক মানুষ এখন রোজার মাসটিকে যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সবশেষে আমার সবিনয় নিবেদন একটিই থাকবে, আর তা হলঃ এইসব সংগঠন বা বাসা-বাড়িতে অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণে ইফতার ইফতার পার্টির এই সম্মিলনী অনুষ্ঠানের চর্চা থেকে সম্ভব হলে দয়া করে বেরিয়ে আসুন। আটলান্টায় মুসলমান বাংলাদেশিদের জন্যে মসজিদ ভিত্তিক রোজাসহ ধর্ম-কর্ম পালন করার এত অবারিত সুন্দর আয়োজন বা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা কি পারিনা গিবত বা পরচর্চা বা ইফতার পার্টির এই পুনঃমিলনী সন্ধ্যার পরিবেশ থেকে নিজেদের মুক্ত করে শ্রেষ্ঠ মাসের ভাবমূর্তিকে পবিত্র করে রাখতে ?

আজকাল অনেকেই কিন্তু বন্ধু-স্বজনদের ইফতারের আমন্ত্রণ দিচ্ছেন বাসা-বাড়ির পরিবর্তে মসজিদে। মসজিদে তারা একদিন বা ততোধিক দিনের জন্যে ইফতার ও রাতের নৈশ ভোজে সকলকে আপ্যায়নের সময় নিয়মিত মুসল্লির পাশাপাশি নিজেদের বন্ধু-স্বজনদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছেন। এর ভেতর দিয়ে আমরা কিন্তু খুব সহজেই রোজার পবিত্রতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি। আর এতে করে গিবত বা অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতার চর্চা থেকে তো নিজেদেরকে অন্তত রক্ষা করতে পারছি ! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই অনুভুতিটুকু বোঝার তওফিক দিক, এই কামনা করি।

রুমী কবিরঃ লেখক, সাংবাদিক ও আশির দশকের কবিগল্পকার, আটলান্টা।

Print Friendly

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*