উত্তর আমেরিকায় রমজান ও ইসলামী জীবনযাত্রা

গোলাম সাদত জুয়েল

আমেরিকায় প্রবাসীরা কেমন করে রোজা রমজান পালন করেন ? এ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের প্রবাসীদের কৌতুহলের শেষ নেই। আমার ১৬ বছরের আমেরিকার প্রবাস জীবনে মনে হয়েছে আমেরিকায় সবচেয়ে ভালভাবে প্রবাসীরা রোজা পালন করেন। আমেরিকার বাহিরে থেকে অনেকে মনে করতে পারেন আমেরিকায় হয়ত বাংলাদেশ বা আরব দেশের মত রোজা রমজান পালন সহজ নয়। আসলে কথাটা ভিন্ন , মসজিদের শহর আমেরিকা। দুই হাজার পাচ শত মসজিদ আমেরিকায়,মাদ্রাসার সংখ্যা কয়েক শত। ইসলাম ধম পালনের সবচেয়ে সহজ জায়গা আমেরিকা, ৫০ টি ষ্টেটের মধ্যে ২৫ /৩০ ষ্টেটে মুসলিম সম্প্রদায় বাস করেন, কয়েক শত ছোট বড় শহরের মুসলিম সম্প্রদায় আছে্ন ভালভাবে। হালাল খাবার ও মসজিদ আজ আমেরিকায় মোড়ে মোড়ে। প্রতি বছর কয়েক শত কোরআনে হাফেজ বেড় হছেছ , তারা নানা শহরে রমজানের তারাবীহ নামাজ পড়ানোর জন্য ছুটছে । রমজানের প্রস্তুতি প্রবাসীরা সবচেয়ে ভালভাবেই গ্রহন করেন। মসজিদে টেন্ট বসিয়ে রোজাদারদের ইফতার খাওয়ানো্ হয়। ২০০ থেকে ৫০০ জন রোজাদার মসজিদে মসজিদে ইফতার করেন , ৩০ দিনে মসজিদে ইফতার দেবার জন্য প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যায়।

মোটামুটি আমেরিকার ২৫০০ মসজিদে একই চিত্র, তবে বাংলাদেশী অধ্যূষিত মসজিদগুলোতে তা বেশী দেখা যায়। ১৫ ঘন্টার রোজা আমেরিকায় , প্রতি মসজিদে খতমে তারাবী নামাজ পড়ানো হয়। রাত ১০ টায় শুরু হয়ে রাত সাড়ে এগারটায় কিংবা বারোটায় শেষ হয়। তরুণ হাফিজরা এক ষ্টেট থেকে অন্য ষ্টেটে যান নামাজ পড়াতে ,অনেক সময় লন্ডন থেকেও নতুন প্রজন্মের কোরআনে হাফিজদের আনা হয়। মোটকথা পুরো আমেরিকা জুড়ে রমজান মাসে অন্য রকম আবহ তৈরী হয়ে যায় , নামাজিদের সংখা বেড়ে যায়। মুসলিম প্রধান এলাকায় হালাল গ্রোসারীগুলোতে চলে নানান পণ্যের সেল। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আরবী, পাকিস্তানী, বাংলাদেশী প্রবাসীরা রমজানে কাজ কমিয়ে এবাদতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে এতেকাফে শুরু হলে সেখানেও প্রবাসীদের ভীড় দেখা যায়।

নিউইয়ক , মিশিগান, ফ্লোরিডা, আটলান্টা, নিউজাসি ,বাফেলো , টেক্সাসসহ বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকার মসজিদ গুলোতে বাংলাদেশী প্রবাসীদের ভীড় দেখা যায় রমজানে। প্রবাসী বা্ংলাদেশীদের নতুন প্রজন্ম ইসলামি স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ে। ফলে তাদের বেশীর ভাগ স্কুল ও মাদ্রাসা রমজানে বন্ধ থাকে বলে তাদের রোজা রাখতে অসুবিধা হয় না । এবার রমজান কিছুটা সামারে হবার কারনে অনেক প্রবাসী ছেলেমেয়েরা রোজা রাখতে পারছে। নি্উ ইয়ক , নিউ জাসি ও মিশিগানে অনেক নতুন প্রজন্ম মাদ্রাসা শিক্ষার শেষ ধাপে হাফিজী শেষ করে তারা আলিমি পড়াশুনা করছে। তাদের বেশীর ভাগই বিভিন্ন ষ্টেটে তারাবীহ নামাজের জন্য ব্যস্ত সময় কাটাচেছ ।

সব সম্ভবের দেশ আমেরিকায় সব কিছুই সহজে লাভ করা যায়। যেমন যে ডাক্তার হতে চায় সে চেষ্টা করে ডাক্তার হবার। যে প্রকৌশলী হতে চায় সে চেষ্টা করলেই প্রকৌশলী হতে পারে। যে আইনজীবী হতে চায় সে আইনজীবী হতে পারে। একইভাবে যে দ্বীনের রাস্তায় যেতে চায় সে ইসলামী ধারা লেখাপড়ার শেষ ধাপে যেতে পারে।

হাফিজি বা উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য আবার তারা সাউথ আফ্রিকা বা ইংলান্ডেও চলে যায়। এরাই আবার সময়মত আমেরিকার স্বাভাবিক লেখা পড়া করে তাদের ক্যারিয়ারও গড়ে তোলে।

আমার ভাগ্নে ১৪ বছর বয়সে হাফিজী শেষ করেছিল ,অসম্ভব মেধাবী শাহির রহমান ধর্মীয় শিক্ষা শেষ করে এরপর ল ডিগ্রী শেষ করে এখন ওয়াশিংটন বারে কাজ করছে। সে ২০০৮ সালের ওবামার নিবাচনের ওরলান্ডো ফ্লোরিডার ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ছিল , সে গত বছরের হিলারীর নিবাচনে হিলারী জন্য ও্য়াশিংটিনে কাজ করছে  শাহির রহমান ছাড়াও আমার আরও দুটি ভাগ্নে মাহফুজুর রহমান এবং মাসুদুর রহমানও একইভাবে কোরআনে হাফিজী সম্পন্ন করে আমেরিকান সাধারন ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছে। তারা একসময় সবাই বিভিন্ন মসজিদে বছরের পর বছর তারাবীহ নামাজ পড়িয়েছে।

আমেরিকার তরুণ‍ হাফিজদের পরিসংখানে দেখা যায় এর সংখ্য কয়েক হাজার। কয়েক শত মাদ্রাসা ও ইসলামী স্কুল থেকে কোরআনে হাফিজ বের হচেছ প্রতি বছর। আমেকিকায় ইসলামী জীবন যাত্রা দুদশক আগে যেমন কঠিন ছিল তা আজ আর সেরকম নেই। ৫০ / ৬০ টি পরিবার মুসলিম পরিবার এক হলেই মসজিদ গড়ে উঠে এবং বছর খানেক পর তা কয়েকশ’তে চলে যায়। কেও যদি চায় তার জীবন ইসলামী কালচারে চালাবে সে চালাতে পারে। সেটা নিভর করে তার ইচছার উপর। তাবলিগ সারা আমেরিকায় সরব গতিতে চলমান। বছর ব্যাপী চলে তাদের ‍ইসতিমা। মহিলারা আমেরিকায় যতটুকু পর্দা মেনে চলেন তা খোদ বাংলাদেশে কেউ মানছেন না। রাস্তায় বের হলে খুব কম মুসলিম মহিলা পাওয়া যাবে যারা হিজাব দেন না ।

আমেররিকায় বাংলাদেশীদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বড় করে তুলতে পিতা মাতারা খুবই সজাগ।   অবাধ স্বাধীনতার আমেরিকায় পিতা মাতারা একটু অসাবধান হলেই সন্তানরা বিপথে চলে যেতে পারে। আর যারা এটা বিশ্বাস করেন তারা অনেক সচেতন। অনেকে আবার সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সন্তানদের হারিয়ে অকুল সাগরে ভাসছেন। সময় মত সন্তানদের দেখাশুনা না করায় তারা আজ সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। তাই অনেক পিতা মাতা মসজিদের আশে পাশে থাকারে চেষ্টা করছেন। আমেরিকায় যদি পিতা মাতারা তাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে ঠিক মত শাসন করতে না পারেন তাহলে তাদের অনেক মুল্য দিতে হয়। অনেকে প্রতি বছর দেশে নিয়ে যান ছেলেমেয়েদেরকে দেশীয় কালচার অনুশাসন শেখানোর জন্য।

মুক্ত স্বাধীনতার দেশ আমেরিকায় যেমন তরুণ হাফিজ বাড়ছে আবার সেই অনুপাতে অনেক তরুণ ছেলেমেয়েরা পিতা মাতা ছেড়ে মেয়ে বন্ধু বা ছেলে বন্ধু নিয়ে উধাও হয়ে যাচেছ , পিতামাতা তখন শুধু চোখের পানি ফেলছেন। রমাজানের সংযমের উপলব্ধি বুঝে যারা প্রবাসে রোজা রাখে তারা জানে সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তোলার পদ্ধতিটাও। এটার গুরুত্ব অবশ্য অনেকেই তা বুঝেন না। তারা মনে করেন আমেরিকায় ডলার কামানোর জায়গা ,সুখের জায়গা , ভোগের জায়গা। তারা বুঝতে চান না এই জীবন ক্ষনিকের। আল্লাহ যে কোন সময় যে কাউকে নিয়ে যাবেন। রমজানে আত্মশুদ্ধি লাভের আশায় এই বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই জীবনে সফলতা আসবে।

গোলাম সাদত জুয়েল : সাংবাদিক -কলামিষ্ট ( ফ্লোরিডা )

Print Friendly