আজ রক্তাক্ত ২১ আগস্ট।। টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা।। মুফতি হান্নানের জবানবন্দী

0
32

ঢাকাঃ আগস্টের কান্না যেন থামার নয়। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের শোকাবহ ক্ষতের পর আবারও ২০০৪ সালে এসে ২১ আগস্টে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করার নৃশংস অপচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুসহ গোটা পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার পর দ্বিতীয় ধাপের টার্গেট বঙ্গবন্ধু কন্যার দিকে। আর এভাবেই জাতির জীবনে আগস্ট আসে কলঙ্কের সাক্ষী হয়ে। পিতা হারানোর এ মাসে যেন রক্তখেলা ফুরায় না।

আজ রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। সেদিনের বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ সভ্য জগতের ললাটে কালিমা লেপে দেয়। সেদিন ছিল একটি সংগঠন নির্মূলের কালো অধ্যায়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুরের পর থেকেই সমাবেশস্থলে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হতে থাকে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী এক মিছিল হওয়ার কথা। মিছিলপূর্ব সমাবেশের জন্য মঞ্চ করা হয় ট্রাকের ওপর।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা বেজে ২২ মিনিট। কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্য শেষে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা বক্তব্য দিচ্ছেন। তার সন্ত্রাসবিরোধী ঝাঁঝাল বক্তব্যে গোটা সমাবেশ তখন উদ্দীপ্ত। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তব্যের ইতি টেনেছেন। হাতে একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে মঞ্চের সিঁড়ির কাছে এগিয়ে আসছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নিচে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান হাত বাড়িয়ে শেখ হাসিনার জন্য অপেক্ষারত…

ঘাতকদের তর যেন আর সইল না। ঠিক তখনই বিকট শব্দ। মুহুর্মুহু গ্রেনেড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গোটা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। মুহূর্তেই রক্তগঙ্গা বয়ে গেল পিচঢালা কালোপথ। আওয়ামী লীগ কার্যালয় চত্বর যেন এক মৃত্যুপুরী। রক্ত-মাংসের স্তূপে ঢেকে যায় সমাবেশস্থল। পরপর ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণে প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন শত শত মানুষ।

ওই হামলার প্রধান টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। এ কারণে প্রথম গ্রেনেডটি মঞ্চ অর্থাৎ ট্রাক লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু ট্রাকের ডালায় লেগে গ্রেনেডটি নিচে বিস্ফোরিত হয়। দেহরক্ষী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ত্যাগের বিনিময়ে প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

১৩টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেই ঘাতকরা ক্ষান্ত হয়নি। জীবিত আছেন জেনে তারা শেখ হাসিনা ও তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনার গাড়িটি বুলেটপ্রুফ হওয়ায় এ যাত্রায়ও তিনি প্রাণে রক্ষা পান। ঘাতকের গুলি গ্লাস ভেদ করে শেখ হাসিনাকে আঘাত করতে পারেনি। তবে তাকে আড়াল করে ঘাতকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেন দেহরক্ষী ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশিদ।

বর্বর ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনা বাম কানে মারাত্মক আঘাত পান। আঘাতপ্রাপ্ত কানে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তাকে হত্যার মূল পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও ওইদিনের বীভৎসতা এক কালো অধ্যায়ের জন্ম দেয়। ঘাতকের প্রথম নিক্ষেপ করা গ্রেনেডটি ট্রাকের ওপর বিস্ফোরিত হলে ওই দিন হয়তো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই প্রাণ হারাতেন। রচিত হতো আরেক ১৫ আগস্ট।

বিস্ফোরিত ১৩টি গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বহু মানুষ। অনেকের হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিহতদের নিথর শরীর আর আহতদের বেঁচে থাকার করুণ আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আকাশ-বাতাস।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলা চালানোর জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদের প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানকে সবধরনের সহায়তা করেছিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান- এই মর্মে জবান বন্দীতে বলেন মুফতি হান্নান।

অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভুঁইয়ার কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে মুফতি হান্নান বলেন, ‘আমি, মাওলানা আবদুস সালাম, আবদুর রউফ, মাওলানা তাজউদ্দিন এবং কাশ্মীরের অধিবাসী আবদুল মাজেদ ভাট ২০০৪ সালে মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদ রোড এলাকায় একটি বৈঠক করি। সেখানে আমরা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদেরকে হত্যার পরিকল্পনা করি। মাওলানা তাজউদ্দিন গ্রেনেড গ্রেনেড সংগ্রহ করার দায়িত্ব নিয়ে বলেন, তার ভাই উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আমাদেরকে সহায়তা করবেন। এছাড়াও আমরা তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নেই।’

মুফতি হান্নান বলেন, ‘আমি সঠিক তারিখ বা সময় স্মরণ করতে পারছি না কিন্তু পরের দিন মুরাদনগরের সংসদ সদস্য কায়কোবাদ (কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ) আমাদেরকে হাওয়া ভবনে নিয়ে যান। তিনি সেখানে আমাদেরকে তারেক জিয়া (তারেক রহমান) ও হারিছ চৌধুরীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আমাদের অপারেশনের জন্য আমরা তাদের সহায়তা কামনা করলে তারেক জিয়া এ ব্যাপারে সবধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।’

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরো বলা হয়, মুফতি সেখানে হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াত নেতা মুজাহিদ, ব্রিগেডিয়ার রেজ্জাকুল হায়দার (ডিজিআইএফের তৎকালীন মহাপরিচালক), ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিমকে (এনএসআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক) দেখতে পান। পরে সেখানে তারেক জিয়া উপস্থিত হন। তারা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর হামলার পরিকল্পনার বিষয়টি তারেককে অবহিত করেন এবং তার সাহায্য চান। তখন বিএনপি’র নীতিনির্ধারকরা তাদেরকে প্রশাসন থেকে সর্ব প্রকার সাহায্যের নিশ্চয়তা দেন। স্বীকারোক্তিতে বলা হয়, বৈঠকে তারেক তাদেরকে কখনো হাওয়া ভবনে না যাওয়ার কথা বলেন। তিনি মুফতি ও তার সহযোগীদেরকে বাবর ও পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং হামলার ব্যাপারে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্যও তাদেরকে বলেন।

২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার কারণে ইতোমধ্যে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শহীদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে।
তাই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা থেকে তাদের নাম ইতোমধ্যে বাদ দেয়া হয়েছে।

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email